Pages

উইঘুর সম্প্রদায় হারিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন ঐতিহ্যঃ

ইতিহাস ইদানীং খুব ভাল লাগে। তাই বিষয়টা নিয়ে সময় সুযোগ করে স্টাডি করে তার চৌম্বক অংশ এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি! যদিও বললাম চৌম্বক অংশ কিন্তু লেখার আগেই মনে হচ্ছে লেখাটা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তবে ধৈর্য্য নিয়ে পড়লে অনেক কিছুই জানার অবকাশ আছে।
আপনারা অনেকেই উইঘুর সম্প্রদায় সম্পর্কে কমবেশি শুনেছেন! এটাও জানেন চীন সরকার তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। আমি এই উইঘুর সম্প্রদায় সম্পর্কে কিছু তথ্য আপনাদেরকে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

দমন নিপিড়নের আধুনিক চৈনিক সভ্যতাঃ

#উইঘুর_সম্প্রদায়_হারিয়ে_যাওয়া_এক_প্রাচীন_ঐতিহ্যঃ
মানচিত্রে জিনজিয়াং প্রদেশ।    
উইঘুর মধ্য এশিয়ায় বসবাসরত প্রাচীন তুর্কী বংশোদ্ভূত
এক মুসলিম জাতি। পূর্বে যা ছিল উইঘুরিস্তান বা পূর্ব তুর্কীস্তান নামে এক স্বাধীন রাস্ট্র। বর্তমান চীনের জিনজিয়াং প্রদেশ নামে পরিচিত। জিনজিয়াং চীনের সর্বোবৃহৎ প্রদেশ। জিনজিয়াং এর রাজধানীর নাম উরুমকি। আয়তন ১৬ লক্ষ ৪৬ হাজার ৪০০ বর্গ কিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে যা বাংলাদেশের প্রায় ১২ গুণ বড়! মধ্যযুগে তুর্কীদের হাতে তাং সম্প্রদায়ের পতনের মাধ্যমে উইঘুরিস্তানের জন্ম হয়। প্রায় ৫৮ শতাংশ মুসলমানদের বসবাস ছিল উইঘুরিস্তানে। ইসলাম ও আরব্য সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তারে সে সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। কৃষি ও খনিজ সম্পদই ছিল এ অঞ্চলের মানুষের আয়ের মূল উৎস। তেল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ছিল উইঘুরিস্তান।
১৬৬৪ সালে চীনের মানচু শাসকরা কিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার সময় অন্যান্য এলাকার সঙ্গে মুসলমানদের স্বাধীন রাস্ট্র উইঘুরিস্তানকেও দখল করে নেয়। পরবর্তীতে এই অঞ্চলের স্বাধীনচেতা মুসলমানেরা অব্যাহত আন্দোলনের মাধ্যমে কিম শাসকদের বিতাড়িত করে আবারও স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু চীনা সমাজতান্ত্রিক শাসকরা অঢেল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ উইঘুরিস্তানে আবারও আক্রমণ করে দখল করে নেয় এবং এর নাম দেয় জিনজিয়াং। যার অর্থ হলো নতুন ভূখণ্ড।
সেই থেকে উইঘুর সম্প্রদায় পরাধীনতায় আবদ্ধ হয় এবং কেড়ে নেওয়া হয় তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার। ধীরে ধীরে আর্থ সামাজিক বৈষম্যের শিকার হতে থাকে উইঘুররা। সরকারি চাকরিতে তাদের অবস্থান কমে আসতে থাকে। যারা সরকারি চাকরি করে তারা বেতন ভাতায় হাং দের তুলনায় বিরাট বৈষম্য নিয়ে চাকরি করতে হতো। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে নেমে আসে বিধিনিষেধ। ১৮ বছরের নিচে কেউ মসজিদে যেতে পারবে না। ৫০ বছরের কম বয়সী কেউ প্রকাশ্যে নামাজ আদায় করতে পারবে না। রোজা রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। কেউ গোপনে রোজা রেখেছেন জানতে পারলে রোজা ভাংতে বাধ্য করা হয়।
কোরআন পড়া ও শেখা নিষিদ্ধ করা হয়। সীমিত কিছু ক্ষেত্র ছাড়া কোরআন তেলাওয়াত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।

উইঘুর নারীদের উপর নির্যাতন (ছবিঃগুগল)  

নিষিদ্ধ করা হয় নারীদের হিজাব পরিধান। হিজাবি কোন নারীকে ট্যাক্সিতে উঠালে ড্রাইভার কে মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হয়। ডাক্তার কে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় হিজাবি নারীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের ইসলামি পোশাক ও দাড়ি রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। ফ্যাশনের জন্য দাড়ি রাখলে সমস্যা নেই কিন্তু উইঘুর দাড়ি রাখলে তাকে ধর্মীয় উগ্রপন্থী হিসেবে নির্যাতন চালানো হয়। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোন প্রকার আলোচনা, গান বাজনা নিষেধ করা হয়। সরকারের নীতির বিরোধিতা বা সমালোচনা করলেই কঠোর শান্তি পেতে হয়। একসময় জিনজিয়াং এ দুই হাজার মসজিদ ছিল। কিন্তু দিন দিন তা গুড়িয়ে দিয়ে সেখানে করা হয়েছে পর্যটন কেন্দ্র!

#উইঘুর_সম্প্রদায়ের_সংস্কৃতিঃ
উইঘুর সম্প্রদায়ের  মূল সংস্কৃতি ছিল তুর্কী ও আরবী। যুগে যুগে তাদের ভাষা ও সাহিত্য পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়। নবম শতকে তুর্কীদের আগমনের ফলে তাদের মধ্যে তুর্কী ভাষা ঢুকে পড়ে। পরবর্তীতে ইসলাম ধর্মের আধিক্যের কারণে আরবি বর্ণমালা তাদের ভাষায় স্থান করে নেয়। সাকা, টোটারিয়ান, গান্ধারী সহ বিভিন্ন ভাষাভাষীতে কথা বলতো উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়। বর্তমানে তারা কোনা ইয়েজিক নামক ভাষায় কথা বলেন।
তাদের সংগীত মুকাম নামে পরিচিত। ১২ টি মুকামকে তাদের জাতীয় কাব্যগ্রন্থে রুপ দিয়েছে। উইঘুরদের এই মুকামকে মানব সভ্যতার অন্যতম UNESCO এর অধরা ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তাদের সংস্কৃতির অন্যতম অংশ হলো নাচ! ডাপ নামের এক প্রকার ঢোলের সাথে "সানাম" ও "সামা" নামের লোকনৃত্য উইঘুরদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় ছিল।
বন্দী শিবিরের বাইরে পাহারায় চীনা সামরিক বাহিনী    


স্বাধীনতা হারানোর পর উইঘুর সম্প্রদায় চীনা সরকারের কাছ থেকে মৌলিক অধিকার গুলো ফিরে পাবার আশা করে। ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার হারানোর পর তারা বুঝতে পারে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ছাড়া অধিকার অধিকার ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই তারা আবারও পরিকল্পনা করে জিমজিয়াং প্রদেশে উইঘুরিস্তান নামে স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু গনতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তা কোন পশ্চিমা দেশ কিংবা বর্তমান বিশ্বের অর্ধশতাধিক মুসলিম দেশের কেউই তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।
সর্বশেষ চীনা সরকার ১৯৪৯ সালে তাদের স্বাধীনতার শেষ প্রচেষ্টা গুড়িয়ে দেয় এবং উইঘুর সম্প্রদায়ের এই স্বাধীনতার আন্দোলন কে বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় উগ্রতা আখ্যা দিয়ে তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে নিরুপায় হয়ে উইঘুর তরুণরা প্রতিবাদী হয়ে উঠে এবং নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ ও দমনপীড়নের মাধ্যমে তাদেরকে প্রতিহত করে।
বর্তমানে জিমজিয়াং এর দুর্গম এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ৩৯ টি বন্দী শিবির। যেখানে বন্দী করা হয়েছে ২০ লাখের বেশি উইঘুর মুসলিম যুবক ও নারীদের! এসব বন্দী শিবিরে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
অপর দিকে চীনা সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী তারা এদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে সাহায্য করছে। ক্যাম্প থেকে পালানো উদ্ভাস্তুরা বিদেশি গণমাধ্যমে তাদের উপর চালানো অমানবিক শারিরীক ও মানষিক নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছে। এসমস্ত ক্যাম্পে সরকার কমিউনিস্ট মতামতে বাধ্য করতে জোর প্রচেষ্টা চালানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। চীনা সরকার এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে আখ্যা দিয়েছে। বিশ্বের মানবাধিকার কোন সংগঠন উইঘুর সম্প্রদায়ের পক্ষে এই অন্যায়ের কোন জোর প্রতিবাদের তেমন কোন নজীর এখনো পাওয়া যায় নি! এই দমন নিপিড়নের মধ্যে হারিয়ে যাবার পথে পৃথিবীর একটি প্রাচীন সম্প্রদায় উইঘুর মুসলিম ইতিহাস।

তথ্যঃ গুগল, উইকিপিডিয়া 

পোস্টের ফেসবুক লিংক   
ফেসবুকে আমি মোকাম্মেল হক সোহেল     

Mokammelsohel's Blog

I am Mokammel Sohel. I love writing, researching and spreading knowledge

No comments:

Post a Comment