Pages

ছাদ উদ্যান: একটি আধুনিক কৃষি বিপ্লব।

Rooftop Garden:A Revolution of Modern Agriculture.
ছাদ উদ্যান: একটি আধুনিক কৃষি বিপ্লব।
ছবিঃছাদ বাগান(গুগল থেকে নেয়া)    


ইট কাঠের নাগরিক সভ্যতায় শহরগুলো থেকে যখনই ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ। ঠিক তখনই কিছু সৌখিন মানুষ প্রকৃতিকে ভালবেসে গড়ে তুলতে শুরু করে নিজের
একান্ত নিজস্ব গন্ডির ভেতর সবুজায়ন। গ্রাম বাংলায় বেড়ে উঠা নাগরিক সমাজের কিছু মানুষ সবুজকে ধরে রাখতে চায় আবাসস্থলে। শৌখিন মানুষরা তাদের বসতবাড়িতে সবুজকে ধরে রাখার জন্য একান্ত নিজস্ব ভাবনা আর প্রচেষ্টায় বাড়ির ছাদ, ছোট বারান্দায় তৈরি করছে বাগান। সময়ের বিবর্তনে এ বাগান এখন আর শৌখিনতায় সীমাবদ্ধ নেই। তা বিস্তৃত হয়ে এখন রুপ নিয়েছে ছাদ বাগানে যাকে আমরা রুফটপ গার্ডেনিং বলি। পারিবারিক পুষ্টির চাহিদাপূরণে অর্গানিক সবজি, ফলের উৎস হয়ে উঠছে ছাদ বাগান। একান্ত অবসরে সময় কাটানোর জন্য ছাদ বাগান একটা নির্মল বিনোদনের স্থানে পরিণত হয়েছে।
এক কথায় ছাদ বাগান আমাদের শহর গুলোতে কৃষিকে শিল্পের রুপ দিয়েছে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, আইনজীবী যেকোনো পেশার মানুষের জন্যই ছাদ বাগান এখন একটা সৌখিন নিরব কৃষি বিপ্লব!

ক্রমান্বয়ে নগরায়ন বাড়ছে বিশ্বব্যাপী। পরিবেশ আর প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় আর নগরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে অনেক দেশেই বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুটপাত,পার্ক, সরকারি খাস জমি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে উদ্যান ফসল ও বাহারি ফুলের গাছের সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে সবুজ নগরায়ন।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ বসবাস করেন নগরে। ১৯৫০ সালে যা ছিল ৩০ শতাংশ। সভ্যতার উন্নয়নে নগরমুখী মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০৫০ সালে পৃথিবীর প্রায় ৬৬ শতাংশ লোক নগরে বসবাস করবে। অতিরিক্ত মানুষের বাস উপযোগী রাখতে নগর উন্নয়নের বিকল্প নেই। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি নগরায়ণ হচ্ছে উত্তর আমেরিকায়। এখানে ৮২ শতাংশ মানুষ নগরে বসবাস করে। ২য় অবস্থানে রয়েছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ। সেখানে ৮০ শতাংশ লোক নগরে বাস করে। সেই তুলনায় আফ্রিকা ও এশিয়ায় নগরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কম, যথাক্রম ৪০ও ৪৮ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটি লোক নগরে বসবাস করে। ২০২০ সালে শতকরা ৫০ ভাগ অর্থাৎ সাড়ে আট কোটি লোক নগরে বাস করবে।  এমন প্রেক্ষাপটে নগরকে পরিকল্পিত আকারে গড়ে তুলতে না পারলে তা আমাদের জন্য বিরুপ প্রতিক্রিয়ার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক নয় বরং ব্যক্তিগত উদ্যোগেই এদেশে ছাদ বাগানের মাধ্যমে আমাদের সীমিত ভূমির শহরগুলোতে বহুতল ভবন নির্মাণে যেখানে মাটির অস্তিত্ব ক্রমেই কমে আসছে যেখানে ইট,কাঠ আর ইস্পাতের ভবনে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বহুতল ভবন সেসব অসংখ্য ভবনে বা এর কাঠামোতে বাগান স্থাপন করা হলে বাগানের গাছ থেকে নির্গত জলীয় বাষ্প প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখবে। পরিকল্পিত ও  বিজ্ঞানসম্মত  উপায়ে ফুল, ফল, শাকসবজির বাগান গড়ে তোলা হলে তা আমাদের পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা বহুলাংশে পূরণ করবে। অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায়, ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখে ছাদ বাগান করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মনে রাখতে হবে ছাদ বাগান একটা শখ, ধৈর্য্য ও সাধনার ব্যাপার! হুটহাট করে এটা কখনো সম্ভব নয়। ঠিক যেমনটি নবজাতকের জন্মের পর থেকে খুব আদর ভালবাসা দিয়ে বড় করে তুলতে হয়, ছাদ বাগানের ব্যাপার টা অনেকটা সে রকম। তাই যারা সম্পূর্ণ নতুন করে ছাদ বাগান করতে আগ্রহী তারা নিচের বিষয় গুলো খুব ভাল ভাবে লক্ষ রাখবেন।

✅প্রয়োজনীয় উপকরণঃ

1⃣একটি খালি ছাদ/ বারান্দা/ বাসার বেলকনি।
2⃣হাফ ড্রাম, সিমেন্ট বা মাটির টব, পুরনো বালতি, ষ্টিল বা প্লাস্টিক ট্রে, বিভিন্ন সাইজের পুরনো ডিস, বোতল ইত্যাদি।
3⃣ছাদের সুবিধা মত স্থানে স্থায়ী বেড(ছাদ ও বেডে মাঝে ফাঁকা রাখতে হবে)
4⃣কোদাল, কাচি, ঝরনা, বালতি, করাত, খুরপি, স্প্রে মেশিন ইত্যাদি।
5⃣দোঁআশ মাটি, পঁচা শুকনা গোবর ও কম্পোষ্ট, ব্যবহারের পর শুকনো চাপাতা, কোকোডাস্ট,  বালু ও ইটের খোয়া ইত্যাদি।
6⃣ সুস্থ সবল গাছের চারা, কলম বা বীজ।

✅চাদে চাষ উপযোগী গাছঃ

বিভিন্ন জাতের ফলঃ বারি আম-৩ (আম্রপালি), বাউ আম-২ (সিন্দুরী), পেপে, কলা, ডালিম, আনার, লিচু,বারি পেয়ারা-২, ইপসা পেয়ারা-১,বাউ কুল-১, ইপসা কুল-১ (আপেল কুল), থাই কুল-২, বারি লেবু -২ ও ৩, বাউ কাগজি লেবু-১, বারি আমড়া-১, বাউ আমড়া-১, বারি কমলা-১, বারি মাল্টা-১,বাউ জামরুল-১ (নাসপাতি জামরুল),
বাউ জামরুল-২ (আপেল জামরুল) ইত্যাদি।

শাক/সবজিঃ লাল শাক, পালং শাক, মুলা শাক, ডাটা শাক, কলমী শাক, পুইঁশাক, লেটুস, বেগুন, টমেটো, মরিচ, লাউ, কুমড়া, চিচিঙ্গা, করলা, শীম ইত্যাদি।

ফুলঃ গোলাপ,গাদা, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, বেলী, শিউলি, ডালিয়া,দোলনচাঁপা, হাসনাহেনা, জবা, অপরাজিতা, সূর্যমুখী, চন্দ্রমল্লিকা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড ইত্যাদি।

✅পদ্ধতিঃ (ফল জাতীয় বড় গাছের জন্য)
ড্রাম(অর্ধেক কাটা) এর তলদেশে অতিরিক্ত পানি নিস্কাশনের জন্য ১ ইঞ্চি ব্যাসের ৫/৬ টি ছিদ্র রাখতে হবে।
ছিদ্র গুলোর উপর মাটির টবের ভাঙ্গা টুকরো বসিয়ে দিতে হবে। ড্রামের তলদেশে ১ ইঞ্চি পরিমাণ ইটের খোয়া বিছিয়ে তার উপর বালি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
সমপরিমাণ দোঁআশ মাটি ও পঁচা গোবরের মিশ্রণ দিয়ে ড্রামটির দুই তৃতীয়াংশ ভরার পর হাফ ড্রাম অনুযায়ী ড্রাম প্রতি মিশ্র সার আনুমানিক ৫০-১০০ গ্রাম প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভাল ভাবে মিশিয়ে দিতে হবে এবং সম্পুর্ণ ড্রামটি মাটি দিযে ভর্তি করে নিতে হবে।
✅১৫ দিন পর ড্রামের ঠিক মাঝে মাটির বল পরিমাণ গর্ত করে কাংখিত গাছটি রোপন করতে হবে। এ সময় চারা গাছটির অতিরিক্ত শিকড়/ মরা শিকড় সমূহ কেটে ফেলতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে মাটির বলটি যেন ভেঙ্গে না যায়।

✅পরিচর্যাঃ
রোপন করা গাছটি খুটি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে।
রোপনের পর গাছের গোড়া পানি দিয়ে ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজন মত গাছে পানি সেচ ও উপরি সার প্রয়োগ, বালাই দমনব্যবস্থা নিতে হবে। রোপনের সময় হাফ ড্রাম প্রতি ২/৩ টি সিলভা মিক্সড ট্যাবলেট সার গাছের গোড়া হতে ৬ ইঞ্চি দুর দিয়ে মাটির ৪ ইঞ্চি গভীরে প্রয়োগ করতে হবে। গাছের বাড়-বাড়তি অনুযায়ী ২ বারে টব প্রতি ৫০/১০০ গ্রাম মিশ্র সার প্রয়োগ করে ভাল ভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

✅ডাল-পালা ছাঁটাইঃ
গাছের রোগাক্রান্ত ও মরা ডালগুলো ছাটাই করতে হবে এবং কর্তিত স্থানে বোর্দপেষ্ট লাগাতে হবে।
কুল খাওয়ার পর ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি গাছের সমস্ত ডাল কেঁটে দিতে হবে। তাছাড়াও মরা ও রোগাক্রান্ত ডাল গুলো কেটে বোর্দ পেষ্ট লাগাতে হবে।

✅টব বা ড্রামের মাটি পরিবর্তনঃ
প্রতি বছর না হলেও ১ বছর অন্তর অস্তর টবের পুরাতন মাটি পরিবর্তন করে নতুন গোবর মিশ্রিত মাটি দিয়ে পুনরায় টবটি/ ড্রামটি ভরে দিতে হবে। এ সময় খেয়াল বাখতে হবে গাছ যেন বেশী ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। তাই এক স্তর বিশিষ্ট ড্রামের পরিবর্তে দ্বিস্তর বিশিষ্ট ড্রাম ব্যবহার করা উত্তম।

✅বালাই দমনঃ
বালাই দমনে পরিবেশ বান্ধব আইপিএম(ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট) সমন্বিত বালাই ব্যাবস্থাপনা বা আইসিএম পদ্ধতি অনুসরন করতে হবে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া  রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার না করে জৈব রাসায়নিক বালাই নাশক যেমন- নিমবিসিডিন, বাইকাও-১ ব্যাবহার করা যেত পারে।

ছাদ বাগান আমাদের প্রকৃতির সাথে সংযোগ হবার একটি সুযোগ করে দিয়েছে। যে কোনো রঙের তুলনায় সবুজ আমাদের দৃষ্টিতে এবং মনে সবচেয়ে প্রশান্তিদায়ক। তাই সবুজের সমারোহে আমরা প্রফুল্ল হই। যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমিতে ছাদ বাগানের নির্মল সবুজ পরিবেশ আমাদের সতেজ রাখতে সহায়তা করে। তাই ছাদ না পেলে নিজের অফিস কিংবা বাসার বেলকনিতেই গড়ে তুলুন এক টুকরো সবুজ উদ্যান।

সহায়তার জন্য কল করুনঃ ১৬১২৩ নাম্বারে।

কৃষিবিদ মোকাম্মেল হক সোহেল।
০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০।

পোস্টের ফেসবুক লিংক   
ফেসবুকে আমি মোকাম্মেল হক সোহেল   

Mokammelsohel's Blog

I am Mokammel Sohel. I love writing, researching and spreading knowledge

No comments:

Post a Comment